ফ্যাটি লিভারকে এত দিন একটি সাধারণ রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নতুন গবেষণায় এর ভিন্ন ভিন্ন জৈবিক ধরন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের গবেষকেরা বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভার রোগের পাঁচটি স্বতন্ত্র উপধরন শনাক্ত করেছেন। গবেষকদের মতে, এসব উপধরনের সঙ্গে লিভারের ক্ষতি, হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।
২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত গবেষণাটিতে রোগীদের জিনগত বৈশিষ্ট্য, লিভারের এনজাইম, শরীরের ভরসূচক (বিএমআই), রক্তের চর্বি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, একই ধরনের রোগ নির্ণয় হলেও সবার ক্ষেত্রে রোগের গতিপ্রকৃতি ও জটিলতার আশঙ্কা এক রকম নাও হতে পারে। তবে এই পাঁচটি উপধরন শনাক্তের ফলাফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ফ্যাটি লিভার কী?
লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অস্বাভাবিক চর্বির মাত্রা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে এই রোগের সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এবং কিছু অন্যান্য কারণেও লিভারে চর্বি জমতে পারে।
বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভারের আধুনিক নাম হলো এমএএসএলডি (MASLD)। কারও কারও ক্ষেত্রে লিভারে চর্বি জমার পাশাপাশি প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি হয়। এই গুরুতর অবস্থাকে বলা হয় এমএএসএইচ (MASH)। দীর্ঘদিন প্রদাহ চলতে থাকলে লিভারে ফাইব্রোসিস বা ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা একপর্যায়ে সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।
পাঁচটি উপধরন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গবেষণায় চিহ্নিত পাঁচটি জৈবিক উপধরন রোগীদের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করতে পারে। কারও ক্ষেত্রে বিপাকীয় সমস্যার প্রভাব বেশি, আবার কারও ক্ষেত্রে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় রোগের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই উপধরন সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে রোগীর ঝুঁকি অনুযায়ী পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা নির্ধারণ সহজ হতে পারে। তবে বর্তমানে এই পাঁচটি উপধরন শনাক্ত করাই সবার জন্য প্রচলিত চিকিৎসার মানদণ্ড হয়ে যায়নি।
ক্যানসার ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কখন বাড়ে?
ফ্যাটি লিভার থাকলেই ক্যানসার হবে—এমন নয়। তবে লিভারে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, ফাইব্রোসিস ও সিরোসিস তৈরি হলে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে হৃদ্রোগ ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যারও সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম এবং লিভারের ক্ষত মূল্যায়নের অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
লিভার সুস্থ রাখতে কী করবেন?
ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, সুষম খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয় কমানো এবং অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা উপকারী হতে পারে। ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও রক্তের চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি।
ফ্যাটি লিভার শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফলোআপ করুন। নিজে থেকে ওষুধ বা হারবাল উপাদান গ্রহণ করা ঠিক নয়।
মনে রাখবেন: ফ্যাটি লিভারের পাঁচটি উপধরন নিয়ে গবেষণা রোগটি বোঝার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে ক্যানসার বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ভর করে রোগের ধরন, লিভারের ক্ষতির মাত্রা এবং ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।
ত্র: মায়ো ক্লিনিকের গবেষণা, ScienceDaily, এবং ফ্যাটি লিভার রোগবিষয়ক চিকিৎসা নির্দেশিকা।



মন্তব্য করুন