রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে সাধারণত স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়া সব সময় অসুস্থতার লক্ষণ নয়। কখনো কখনো শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও এমনটা ঘটতে পারে।
কেন হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে রক্তে শর্করা?
১. খাবার খাওয়ার পর
ভাত, রুটি, আলু, ফলসহ কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার হজমের সময় গ্লুকোজে পরিণত হয়। ফলে খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে পারে। সুস্থ শরীরে ইনসুলিন এই গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং ধীরে ধীরে মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনে।
২. ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রমের সময়
শারীরিক কার্যকলাপের সময় পেশির শক্তির চাহিদা বেড়ে যায়। সাধারণত ব্যায়াম রক্তে শর্করা কমাতে সাহায্য করে। তবে ভারী ব্যায়াম, দ্রুত দৌড়ানো বা তীব্র শারীরিক পরিশ্রমের সময় শরীরে অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন নিঃসৃত হয়ে সাময়িকভাবে গ্লুকোজ বাড়াতে পারে।
৩. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
মানসিক চাপের সময় শরীর কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন নিঃসরণ করে। এসব হরমোন শরীরকে চাপ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়াতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
৪. অসুস্থতা বা সংক্রমণ
জ্বর, সর্দি-কাশি, সংক্রমণ কিংবা অন্য কোনো অসুস্থতার সময় শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় হয়। এ সময় নিঃসৃত হরমোনের প্রভাবে রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিস থাকলে অসুস্থতার সময় গ্লুকোজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. ঘুমের ঘাটতি ও কিছু ওষুধ
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং স্টেরয়েডজাতীয় কিছু ওষুধ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে। ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ওষুধের সময়সূচি ও মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মেনে চলা জরুরি।
কখন চিন্তার কারণ?
খাবারের পর সাময়িকভাবে রক্তে শর্করা বাড়া স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু মাত্রা বারবার বেশি থাকা, অতিরিক্ত পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি কিংবা ঝাপসা দেখার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
রক্তে শর্করা খুব বেশি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে বমি, পেটব্যথা, দ্রুত বা গভীর শ্বাস, তন্দ্রা কিংবা বিভ্রান্তি দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন?
- নিয়মিত ও পরিমিত খাবার খান এবং খাদ্যতালিকায় আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগ দিন।
- ডায়াবেটিস থাকলে নির্ধারিত সময়ে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন বা বন্ধ করবেন না।
মনে রাখবেন: রক্তে শর্করা সাময়িকভাবে বাড়া সব সময় বিপদের সংকেত নয়। তবে কতটা বেড়েছে, কতক্ষণ বেশি থাকছে এবং ব্যক্তির ডায়াবেটিস আছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। একবারের একটি রিডিংয়ের ভিত্তিতে রোগ নির্ণয় করা যায় না।
তথ্যসূত্র: আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন (ADA), যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH) এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্ভরযোগ্য প্রকাশনা।



মন্তব্য করুন