ইসাবেল পেরন, পূর্ণ নাম মারিয়া এস্তেলা মার্তিনেস কার্তাস, আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৩১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার লা রিওহা শহরে তাঁর জন্ম। তিনি ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং বিশ্বের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার সাবেক রাষ্ট্রপতি হুয়ান দোমিঙ্গো পেরনের তৃতীয় স্ত্রী এবং ১৯৭৩–৭৪ সালে তাঁর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মারিয়া এস্তেলা তরুণ বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন। রোমান ক্যাথলিক ধর্মীয় কনফার্মেশনের সময় তিনি ‘ইসাবেল’ নামটি গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে মঞ্চে এই নামেই পরিচিত হন। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি নির্বাসিত হুয়ান পেরনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তিনি নৃত্যশিল্পীর পেশা ছেড়ে পেরনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬১ সালে মাদ্রিদে তাঁদের বিয়ে হয়।

১৯৬০-এর দশক এবং ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ইসাবেল পেরোনিস্ট আন্দোলনের সমর্থন সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালে হুয়ান পেরন নির্বাসন থেকে ফিরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিলে ইসাবেল তাঁর সঙ্গে উপ-রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হন। তাঁরা নির্বাচনে জয়ী হন এবং ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

হুয়ান পেরনের শারীরিক অসুস্থতার সময় ইসাবেল কয়েকবার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালের ১ জুলাই হুয়ান পেরনের মৃত্যুর পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হন।

তবে তাঁর সরকার শুরু থেকেই গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সশস্ত্র সহিংসতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে সরকার ‘স্টেট অব সিজ’ বা জরুরি অবস্থা জারি করে। একই সময়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও ইসাবেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হোসে লোপেস রেগাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। লোপেস রেগার সঙ্গে ডানপন্থী আধাসামরিক সংগঠন আর্জেন্টাইন অ্যান্টিকমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স (Triple A)-এর সম্পর্ক নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ১৯৭৫ সালের জুলাইয়ে লোপেস রেগা মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন এবং পরে তাঁকে স্পেনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হয়।

অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হলে ইসাবেল পেরনের সরকারের ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৬ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর তাঁকে প্রায় পাঁচ বছর গৃহবন্দি রাখা হয়। ১৯৮১ সালের মার্চে একটি ফেডারেল আদালত তাঁকে তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে আট বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরে তিনি মুক্তি পান এবং স্পেনে চলে যান। ১৯৮৩ সালের শেষ দিকে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা ক্ষমা করা হয়।

ইসাবেল পেরনের রাজনৈতিক জীবন এখানেই শেষ হয়নি। ১৯৮৫ সালে তিনি মাদ্রিদ থেকে পেরোনিস্টদের Justicialist Party-এর নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। ২০০৭ সালে আর্জেন্টিনার বিচার বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযোগ ছিল, তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সময় নিরাপত্তা বাহিনী ও Triple A-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার সঙ্গে তাঁর সরকারের সম্পর্ক ছিল। স্পেনে তাঁকে সাময়িকভাবে আটক করা হলেও পরে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে স্পেনের ন্যাশনাল কোর্ট আর্জেন্টিনায় তাঁর প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।

পেরোনিজমের উত্থান

ইসাবেল পেরনের রাজনৈতিক পরিচয় বুঝতে হলে পেরোনিজমের ইতিহাস জানা জরুরি। কর্নেল হুয়ান পেরন ১৯৪৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শ্রমমন্ত্রী হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি শ্রমিকদের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্রের সক্রিয় অর্থনৈতিক ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিপুল শ্রমিক সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

১৯৫৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে পেরন ক্ষমতাচ্যুত ও নির্বাসিত হন। এরপর পেরোনিস্ট আন্দোলন বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হলেও আর্জেন্টিনার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকে। ১৯৭৩ সালে পেরোনিস্টরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং হুয়ান পেরন তৃতীয়বার রাষ্ট্রপতি হন।

পেরনের মৃত্যুর পর আন্দোলনের বাম ও ডানপন্থী অংশের বিরোধ আরও তীব্র হয়। রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ১৯৭৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান পেরোনিস্ট সরকারের অবসান ঘটায়।

১৯৮৯ সালে পেরোনিস্ট নেতা কার্লোস সাউল মেনেম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি প্রচলিত পেরোনিস্ট অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তে বাজারমুখী সংস্কার গ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালে পেরোনিস্টরা ক্ষমতা হারালেও ২০০১ সালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পর আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসে। ২০০২ সালে পেরোনিস্ট নেতা এদুয়ার্দো দুহালদে রাষ্ট্রপতি হন।

কির্চনার যুগ ও আধুনিক পেরোনিজম

২০০৩ সালে পেরোনিস্ট আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির মধ্যেই নেস্তর কির্চনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে তাঁর স্ত্রী ক্রিস্তিনা ফের্নান্দেস দে কির্চনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন এবং আর্জেন্টিনার প্রথম সরাসরি নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপতি হন। ২০১১ সালে তিনি আবার নির্বাচিত হন।

২০১৫ সালে পেরোনিস্ট প্রার্থী দানিয়েল সিওলি দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে রক্ষণশীল প্রার্থী মাউরিসিও মাকরির কাছে পরাজিত হন। এর মাধ্যমে পেরোনিস্টদের দীর্ঘ সময়ের ক্ষমতার ধারায় বিরতি ঘটে।

২০১৯ সালে ক্রিস্তিনা ফের্নান্দেস দে কির্চনার নিজে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী না হয়ে আলবের্তো ফের্নান্দেসকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী এবং নিজেকে উপ-রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করেন। তাঁরা নির্বাচনে জয়ী হয়ে পেরোনিস্ট জোটকে আবার ক্ষমতায় নিয়ে আসেন।

তবে ২০২৩ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পেরোনিস্ট প্রার্থী ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সের্হিও মাসা পরাজিত হন। নির্বাচনে বিজয়ী হন লিবার্টারিয়ান অর্থনীতিবিদ হাভিয়ের মিলেই। এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ও পরিবর্তনশীল পেরোনিস্ট রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করে।

ইসাবেল পেরনের রাজনৈতিক জীবন তাই শুধু একজন নারী রাষ্ট্রপতির ইতিহাস নয়; এটি আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক সংকট, সামরিক হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং পেরোনিজমের দীর্ঘ রূপান্তরের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

সফলতার গল্পের সংকলন

Facebook Comments Box