সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে ব্রাজিলের ‘রেইনহা’র বিশ্বজয়
স্পোর্টস ডেস্ক:
ছোট শহরের রাস্তায় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলে যে মেয়েটি নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, একদিন তিনিই হয়ে ওঠেন বিশ্ব নারী ফুটবলের পরিচিত মুখ। তাঁর নাম মার্তা ভিয়েইরা দা সিলভা—বিশ্বজুড়ে যিনি শুধু ‘মার্তা’ নামেই পরিচিত।
১৯৮৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের আলাগোয়াসের দোইস রিয়াশোসে জন্ম নেওয়া মার্তার শৈশব ছিল না কোনো বিলাসী ফুটবল একাডেমির ভেতর। ছিল সীমিত সুযোগ, কঠিন বাস্তবতা আর ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলের পথে পা রাখেন তিনি। সেই শুরু থেকেই তাঁর যাত্রা ছিল নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই।
প্রতিভা থেকে বিশ্বসেরার পথে
মার্তার অসাধারণ ড্রিবলিং, দ্রুতগতি, বল নিয়ন্ত্রণ ও গোল করার দক্ষতা তাঁকে খুব দ্রুত আলাদা করে তোলে। সুইডেনের Umeå IK-এর হয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্লাব এবং Orlando Pride-এর হয়েও তিনি ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করেন।
বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার FIFA World Player of the Year/The Best FIFA Women’s Player তিনি মোট ছয়বার জিতেছেন। ২০০৬, ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৮ সালে এই স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে।

বিশ্বকাপে রেকর্ড
বিশ্বকাপের মঞ্চে মার্তার নাম আরও উজ্জ্বল। নারীদের FIFA World Cup-এ তাঁর মোট ১৭ গোল, যা টুর্নামেন্টটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড।
২০১৯ সালের বিশ্বকাপে ইতালির বিপক্ষে গোল করে তিনি পাঁচটি বিশ্বকাপ আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হন। পরে এই কীর্তির সঙ্গে আরও কয়েকজন পুরুষ ও নারী ফুটবলার যুক্ত হলেও, বিশ্বকাপের ইতিহাসে মার্তার ১৭ গোলের রেকর্ড তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় পরিচয় হয়ে আছে।
২০০৭ সালের বিশ্বকাপে তিনি জিতেছিলেন Golden Ball ও Golden Boot—একই আসরে সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি।
ব্রাজিলের জার্সিতে দীর্ঘ অধ্যায়
জাতীয় দলের হয়ে মার্তার ক্যারিয়ারও সমৃদ্ধ। ব্রাজিলের হয়ে তিনি অলিম্পিকে ২০০৪, ২০০৮ ও ২০২৪ সালে রৌপ্যপদক অর্জন করেছেন।
বিশ্বকাপ, অলিম্পিক ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাঁর ধারাবাহিক উপস্থিতি তাঁকে ব্রাজিল নারী ফুটবলের দীর্ঘস্থায়ী প্রতীকে পরিণত করেছে। দেশের হয়ে গোলসংখ্যার দিক থেকেও তিনি ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড়।

২০২৪—ক্লাব ক্যারিয়ারের বিশেষ বছর
মার্তার ক্যারিয়ারে ২০২৪ সালও বিশেষভাবে স্মরণীয়। Orlando Pride-এর হয়ে তিনি NWSL Shield জেতেন এবং পরে দলটির সঙ্গে প্রথমবার NWSL Championship শিরোপা অর্জন করেন।
অর্থাৎ ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের ইউরোপীয় সাফল্য থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নারী ফুটবল লিগেও নিজের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের প্রমাণ রেখেছেন তিনি।
মাঠের বাইরেও অনুপ্রেরণা
মার্তার সাফল্য শুধু গোল, ম্যাচ ও ট্রফির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। নারী ফুটবলে সমতা, সুযোগ এবং নারীর নেতৃত্ব নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
তাঁর জীবনের গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো—স্বপ্নের জন্য অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষা না করে, সীমাবদ্ধতার মধ্যেই এগিয়ে যাওয়া।
আজ ব্রাজিলে তিনি ‘Rainha’—অর্থাৎ ‘রানি’ নামে পরিচিত। এই উপাধির পেছনে শুধু তাঁর ফুটবল দক্ষতা নয়, রয়েছে দীর্ঘ ক্যারিয়ার, অসংখ্য রেকর্ড এবং পরবর্তী প্রজন্মের নারী ফুটবলারদের জন্য রেখে যাওয়া একটি পথ।
মার্তার সাফল্য যে বার্তা দেয়
মার্তার গল্প মনে করিয়ে দেয়, বড় স্বপ্ন সবসময় বড় শহর বা বড় সুযোগ থেকে শুরু হয় না। অনেক সময় একটি সাধারণ মাঠ, একটি ফুটবল এবং নিজের ওপর বিশ্বাসই হতে পারে যাত্রার প্রথম ধাপ।
গলি থেকে বিশ্বমঞ্চ—মার্তার এই পথচলা তাই শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়; এটি স্বপ্ন, অধ্যবসায়, সংগ্রাম এবং নিজের পরিচয় তৈরি করার গল্প।
FIFA, IOC ও প্রকাশিত ক্রীড়া তথ্যের ভিত্তিতে



মন্তব্য করুন