বিদ্যুৎ ছাড়া একটি রাত কাটানোই যেখানে অনেকের জন্য কঠিন, সেখানে জীবনের দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ছাড়াই কাটিয়েছেন ভারতের খ্যাতনামা উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. হেমা সানে। শুধু তাই নয়, কেরোসিনের প্রদীপ ও তেলের বাতির আলোয় পড়াশোনা করে তিনি অর্জন করেছিলেন বোটানিতে পিএইচডি। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞান, প্রকৃতি, সরলতা ও আত্মনির্ভরতার এক অসাধারণ উদাহরণ।
কে ছিলেন ড. হেমা সানে?
ড. হেমা সানে ছিলেন ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের একজন বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানী, অধ্যাপক, পরিবেশপ্রেমী ও লেখক। তিনি পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বোটানিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং পরে ইন্ডোলজিতে এমফিলও অর্জন করেন।
১৯৬২ সালে তিনি পুনের আবসাহেব গারওয়ারে কলেজে বোটানি পড়ানো শুরু করেন। প্রায় চার দশক শিক্ষকতা করার পর ২০০০ সালে অবসর নেন। একসময় তিনি কলেজটির বোটানি বিভাগের প্রধানও ছিলেন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে গবেষণার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেন।
কেরোসিনের আলোয় পিএইচডির পড়াশোনা
ড. সানের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি ছিল তাঁর বিদ্যুৎবিহীন জীবন। তিনি ছোটবেলা থেকেই বিদ্যুৎ ছাড়া পরিবেশে অভ্যস্ত ছিলেন। উচ্চশিক্ষা ও পিএইচডির মতো কঠিন পড়াশোনাও তিনি তেলের বাতি ও কেরোসিনের আলোয় করেছেন।
তাঁর কাছে বিদ্যুৎ ছিল জীবনের অপরিহার্য কোনো শর্ত নয়। তিনি মনে করতেন মানুষের মৌলিক প্রয়োজন খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয়—বিদ্যুৎ মানবজীবনে পরে এসেছে। তাই আধুনিক সুযোগ-সুবিধার প্রতি নির্ভরশীল না হয়েও তিনি নিজের জীবন ও জ্ঞানচর্চা চালিয়ে গেছেন।
প্রকৃতিই ছিল তাঁর জীবনের বড় শিক্ষক
পুনের বুধওয়ার পেঠ এলাকায় নিজের পুরোনো বাড়িতে তিনি দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ ছাড়াই বসবাস করেছেন। বাড়ির চারপাশ ছিল গাছপালা, পাখি ও বিভিন্ন প্রাণীতে পরিপূর্ণ। তিনি নিজেকে সেই প্রাণী ও প্রকৃতির একজন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ভাবতেন।
বোটানি শেখানোর ক্ষেত্রেও তাঁর পদ্ধতি ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু বই পড়ে উদ্ভিদের নাম মুখস্থ করার বদলে প্রকৃতির কাছে গিয়ে গাছপালা পর্যবেক্ষণ করতে উৎসাহিত করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বোটানি শুধু শ্রেণিকক্ষে বসে শেখার বিষয় নয়—প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের মাধ্যমেই এটি ভালোভাবে বোঝা যায়।
৩০টিরও বেশি বইয়ের লেখক
ড. হেমা সানে শুধু শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন একজন prolific লেখকও। তিনি ৩০টির বেশি বই লিখেছেন। তাঁর লেখায় বোটানি, ঔষধি উদ্ভিদ, উদ্ভিদের গঠন, টেকসই উন্নয়ন, ভারতীয় উদ্ভিদজগৎ এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত গাছপালা উঠে এসেছে।
তাঁর জ্ঞান ও জীবনযাপন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। আধুনিক জীবনের অতিরিক্ত ভোগবাদ থেকে দূরে থেকে তিনি প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন।
তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা
ড. হেমা সানের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাফল্যের জন্য সবসময় আধুনিক সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন দৃঢ় ইচ্ছা, অধ্যবসায়, জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের লক্ষ্যের প্রতি অটুট থাকা।
কেরোসিনের প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় যে নারী তাঁর পিএইচডির পড়াশোনা করেছিলেন, তিনিই পরবর্তীতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীকে উদ্ভিদবিজ্ঞান শিখিয়েছেন এবং ৩০টির বেশি বই লিখে গেছেন।
ড. হেমা সানে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে পুনেতে ৮৫ বছর বয়সে মারা যান। তবে তাঁর সরল জীবন, প্রকৃতিপ্রেম, গবেষণা ও শিক্ষাদানের আদর্শ আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
সফলতার মূলমন্ত্র:
“আলো কম হতে পারে, সুযোগ কম হতে পারে—কিন্তু স্বপ্ন ও অধ্যবসয় থাকলে জ্ঞানের পথ থেমে থাকে না।”



মন্তব্য করুন