বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে নারীদের নেতৃত্বের পথচলায় সিরিমাভো বন্দরনায়েকের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সিলন, বর্তমান শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে তিনি আধুনিক বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধানের মর্যাদা অর্জন করেন। তাঁর এই রাজনৈতিক উত্থান শুধু শ্রীলঙ্কার জন্য নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে।

সিরিমাভো রতওয়াতে বন্দরনায়েকে ১৯১৬ সালে শ্রীলঙ্কার একটি প্রভাবশালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বিয়ে হয় সলোমন বন্দরনায়েকের সঙ্গে, যিনি পরবর্তীতে সিলনের প্রধানমন্ত্রী হন। বিয়ের পর সিরিমাভো মূলত পারিবারিক জীবনেই ছিলেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল সীমিত। কিন্তু একটি মর্মান্তিক ঘটনা তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

১৯৫৯ সালে সলোমন বন্দরনায়েকে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর গুলিতে নিহত হন। স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পর সিরিমাভো ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর স্বামীর প্রতিষ্ঠিত শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি (SLFP)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি দলের নেতা হিসেবে দ্রুত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৬০ সালের নির্বাচনে SLFP গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে এবং সিরিমাভো বন্দরনায়েকে প্রধানমন্ত্রী হন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তাঁর এই বিজয় এমন এক সময়ে আসে, যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বন্দরনায়েকের রাজনৈতিক দর্শনে সমাজতন্ত্র, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। তাঁর সরকার বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা জাতীয়করণের উদ্যোগ নেয়। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়।

১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকার পর তিনি আবার ক্ষমতায় ফেরেন ১৯৭০ সালে। দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর সরকার আরও ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে। ১৯৭২ সালে সিলন নতুন সংবিধান গ্রহণ করে এবং দেশটির নাম পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কা প্রজাতন্ত্র রাখা হয়। একই সঙ্গে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সঙ্গে সাংবিধানিক সম্পর্কের অবসান ঘটে এবং দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।

বন্দরনায়েকের দ্বিতীয় মেয়াদ ছিল নানা চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। তাঁর সরকারের সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক নীতি, জাতীয়করণ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একদিকে সমর্থন থাকলেও অন্যদিকে বিরোধিতাও তৈরি হয়। অর্থনৈতিক সংকট, পণ্যস্বল্পতা ও রাজনৈতিক অসন্তোষ তাঁর সরকারের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

Facebook Comments Box