শিশু নিখোঁজ ও শিশু সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবি

একটি শিশুও হারিয়ে যাক, আমরা চাই না

শিশু নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিশু সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে অগ্রযাত্রা নারী ফোরাম। ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ারের সামনে সংগঠনটির উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি শিশু সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর সন্ধান এবং নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়নি, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।

পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এ বয়সী শিশুদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৯৭০ জন এখনো উদ্ধার হয়নি।

পুলিশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো ঘটনা নিখোঁজ হওয়ার অন্যতম কারণ। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

তবে নিখোঁজের পর শিশুদের একটি অংশ পরবর্তীতে পরিবারের কাছে ফিরে এলেও সব তথ্য সবসময় থানার নথিতে তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ হয় না বলে পুলিশ জানিয়েছে। ফলে এসব পরিসংখ্যানকে শিশু নিখোঁজের চূড়ান্ত ও স্থায়ী সংখ্যা হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

শিশু নিখোঁজের পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০ সেপ্টেম্বরের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে এসেছে।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধার হলে ঘটনাটিকে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুটি কীভাবে নিখোঁজ হলো, উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, কোনো অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না এবং অপরাধের সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

শিশুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

আমাদের দাবি

  • নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর জন্য দ্রুত ও কার্যকর অনুসন্ধান নিশ্চিত করতে হবে।
  • এখনো সন্ধান না পাওয়া ২ হাজার ৩৮ শিশুর বিষয়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে।
  • নিখোঁজ, উদ্ধার এবং এখনো নিখোঁজ শিশুদের তথ্য নিয়ে একটি সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করতে হবে।
  • পুলিশ, পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও শিশু সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
  • নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুর মরদেহ উদ্ধারের প্রতিটি ঘটনায় নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত করতে হবে।
  • দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
  • উদ্ধার হওয়া শিশুদের শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং ও নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

বক্তারা বলেন, একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়া শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; এটি শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। তাই নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর দ্রুত সন্ধান, নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

মানববন্ধনে শিশু নিখোঁজ ও শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।

স্লোগান: “একটি শিশুও হারিয়ে যাক—আমরা তা চাই না।”

প্রচার: অগ্রযাত্রা নারী ফোরাম

Facebook Comments Box