বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে নারীর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে শ্রীমাভো বন্দরনায়েক একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯৬০ সালে তিনি বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর এই অর্জন শুধু শ্রীলঙ্কার জন্য নয়, বিশ্বজুড়ে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে আছে।
শ্রীমাভো রত্নওয়াতে ডায়াস বন্দরনায়েক ১৯১৬ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ সিলনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলম্বোর সেন্ট ব্রিজেটস কনভেন্টে পড়াশোনা করেন। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারে বেড়ে উঠলেও তাঁর জীবনের শুরুতে রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা ছিল না।
তাঁর স্বামী সলোমন বন্দরনায়েক ছিলেন শ্রীলঙ্কার একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা। তিনি শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৫৬ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু ১৯৫৯ সালে আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হন। স্বামীর মৃত্যুর পর শ্রীমাভো বন্দরনায়েক রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীতে তিনি শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালের নির্বাচনে দলটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করলে শ্রীমাভো বন্দরনায়েক প্রধানমন্ত্রী হন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।
প্রথম দফায় ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁর সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা শক্তিশালী করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে তাঁর শাসনামল ছিল নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পূর্ণ। সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে বিরোধিতা তৈরি হয় এবং অর্থনৈতিক সমস্যাও দেখা দেয়। ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ হারান।
১৯৭০ সালে আবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফেরেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েক। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৭২ সালে নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে সিলন প্রজাতন্ত্রী শ্রীলঙ্কায় পরিণত হয়।
এই সময়ে তাঁর সরকার ভূমি সংস্কার, রাষ্ট্রীয়করণ এবং অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর মতো বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে। তবে অর্থনৈতিক সংকট, পণ্যসংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁর সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৭১ সালে তাঁর সরকার একটি বড় যুব বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়। জনতা বিমুক্তি পেরামুনা বা জেভিপির নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই সশস্ত্র বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত দমন করা হয়। তবে এ ঘটনা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে সামনে নিয়ে আসে।
১৯৭৭ সালের নির্বাচনে তাঁর দল বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁর নাগরিক অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়। পরে সেই অধিকার পুনর্বহাল হলে তিনি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
১৯৯৪ সালে শ্রীমাভো বন্দরনায়েক তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা তখন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ফলে একই সময়ে মা ও মেয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
শ্রীমাভো বন্দরনায়েক ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ১০ অক্টোবর সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের রাজনৈতিক জীবন ছিল সাফল্য, বিতর্ক, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক সংঘাত—সবকিছুর সমন্বয়ে গঠিত। তবে বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাঁর নেতৃত্ব নারীদের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরবর্তী সময়ে নারীরা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সেই দীর্ঘ পথচলার ইতিহাসে শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের নাম তাই বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



মন্তব্য করুন