প্রযুক্তিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ: আমাদের মেয়েরা কোথায় হারিয়ে যায়?

বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও কর্মক্ষেত্র, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টের তথ্য এবং বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সাম্প্রতিক কিছু চিত্র সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।

শিক্ষায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। নারী-পুরুষ সমতার স্কোর ৯৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশের এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সামগ্রিক অবস্থানে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে।

তবে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। ১৪৫টি দেশের মধ্যে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম। দেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীদের মধ্যে নারীর অংশ ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে নারী মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ।

প্রযুক্তি খাতেও নারীর কম উপস্থিতির বিষয়টি স্পষ্ট। সম্প্রতি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বৈশ্বিক বাজার নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রায় ৮০ জন শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি অংশ নিলেও সেখানে কোনো নারী ছিলেন না বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক এআই অলিম্পিয়াডে অংশ নিচ্ছে। গত তিন বছরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেওয়া ২৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ে মাত্র একজন—লেখায় এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক ভালো হলেও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও নেতৃত্বের পর্যায়ে গিয়ে তাদের সংখ্যা কেন কমে যাচ্ছে?

প্রায় এক দশক আগে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় মেয়েদের কম অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে রেখে ‘মিসিং ডটার’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মেয়েদের জন্য প্রোগ্রামিং ক্যাম্প, জাতীয় গার্লস প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, মেন্টরশিপ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ দেখার সুযোগ তৈরি করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের প্রযুক্তির জগতে আগ্রহী করে তোলা এবং তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা।

২০১৮ সালে ‘সাপোর্টিং মিসিং ডটারস’ নামে একটি গবেষণাতেও দেখা যায়, বিজ্ঞান বা প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেই মেয়েদের বাধা শেষ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মজীবনে প্রবেশ, বিয়ে ও সন্তান, কর্মজীবনে বিরতি এবং পরে কাজে ফিরে আসার মতো বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন বাধা তৈরি হতে পারে।

তাই শুধু মেয়েদের অনুপ্রাণিত করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মেন্টরশিপ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিশুযত্নের সুযোগ, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মজীবনে বিরতির পর ফিরে আসার ব্যবস্থা এবং নেতৃত্বে যাওয়ার সুযোগ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও এসেছে। একসময় প্রশ্ন ছিল—কীভাবে মেয়েদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে আনা যায়। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—আসার পর কীভাবে তাদের ধরে রাখা যায়?

কোন পর্যায়ে মেয়েদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, কেন কমছে এবং কর্মজীবনের কোন বাঁকে তারা পিছিয়ে পড়ছে—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা জরুরি। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম চাকরি, বিয়ে, সন্তান কিংবা নেতৃত্বের পর্যায়—প্রতিটি ধাপে সমস্যার ধরন আলাদা হতে পারে। তাই সমাধানও হতে হবে পর্যায়ভিত্তিক।

বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি দেখিয়েছে যে পরিবর্তন সম্ভব। এখন সেই অগ্রগতিকে কর্মক্ষেত্র ও প্রযুক্তি খাতেও নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রশ্নটি তাই শুধু ‘আমাদের মেয়েরা কোথায়?’ নয়। বরং জানতে হবে—কোন পর্যায়ে তারা হারিয়ে যাচ্ছে এবং কেন? সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষা থেকে কর্মজীবন এবং কর্মজীবন থেকে নেতৃত্ব পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক পথ তৈরি করাই হতে পারে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

Facebook Comments Box