মার্গারেট হিলডা থ্যাচার ছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতির এক অনন্য চরিত্র। ১৯৭৯ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং টানা ১১ বছর দেশটির সরকার পরিচালনা করেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে তিনি বিশ্বজুড়ে ‘আয়রন লেডি’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ারের গ্রান্থামে জন্মগ্রহণ করেন মার্গারেট রবার্টস। তাঁর বাবা আলফ্রেড রবার্টস ছিলেন একজন মুদি ব্যবসায়ী, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও মেথডিস্ট ধর্মযাজক। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মার্গারেট ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম, আত্মনির্ভরতা ও শৃঙ্খলার মূল্যবোধে গড়ে ওঠেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সামারভিল কলেজে তিনি রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করেন। খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ডরোথি হজকিনের তত্ত্বাবধানে গবেষণাও করেন। ১৯৪৭ সালে স্নাতক হওয়ার পর কিছু সময় গবেষণা রসায়নবিদ হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বিজ্ঞানের পাশাপাশি রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

পরবর্তীতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে তিনি ব্যারিস্টার হন। ১৯৫১ সালে ব্যবসায়ী ডেনিস থ্যাচারকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান—ক্যারল ও মার্ক।

রাজনীতিতে উত্থান

রাজনীতিতে তাঁর প্রথম নির্বাচনী প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৫০ ও ১৯৫১ সালের নির্বাচনে ডার্টফোর্ড আসনে কনজারভেটিভ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। তবে তিনি থেমে থাকেননি। ১৯৫৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে ফিঞ্চলি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ পথচলা শুরু করেন।

১৯৭০ সালে এডওয়ার্ড হিথের সরকারে শিক্ষা ও বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী হন থ্যাচার। ওই সময় স্কুলশিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে দুধ সরবরাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত তাঁকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলে দেয়। সংবাদমাধ্যমে তিনি ‘Milk Snatcher’ নামে পরিচিত হন।

তবে এই বিতর্ক তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ১৯৭৫ সালে এডওয়ার্ড হিথকে পরাজিত করে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হন। এর মাধ্যমে তিনি ব্রিটেনের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রথম নারী নেতা হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন অর্থনৈতিক দর্শন

১৯৭৯ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি জয়ী হলে মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী হন। সে সময় ব্রিটেন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাপক শ্রমিক অসন্তোষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

থ্যাচার অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা কমিয়ে বাজারের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেন। তাঁর সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারিকরণ, ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষমতা সীমিত করা এবং কর ও সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা।

এই নীতিগুলো ব্রিটিশ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। তবে এর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কও তৈরি হয়। বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং শিল্পাঞ্চলগুলোর সংকট তাঁর সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

ফকল্যান্ডস যুদ্ধ ও জনপ্রিয়তার উত্থান

১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ফকল্যান্ডস যুদ্ধ থ্যাচারের রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। যুদ্ধে ব্রিটেনের বিজয়ের পর তাঁর সরকারের প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি পায়। ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি বড় জয় লাভ করে।

এরপর ১৯৮৪–৮৫ সালের খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটের সময়ও থ্যাচার সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। ১৯৮৬ সালে লন্ডনের আর্থিক বাজারে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ ‘বিগ ব্যাং’ নামে পরিচিত হয় এবং ব্রিটেনের আর্থিক খাতে বড় পরিবর্তন আসে।

১৯৮৭ সালের নির্বাচনে থ্যাচার তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন। তবে তাঁর শেষ মেয়াদে নানা রাজনৈতিক সমস্যা সামনে আসে। বিশেষ করে ‘কমিউনিটি চার্জ’ বা ‘পোল ট্যাক্স’ নিয়ে ব্যাপক জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ইউরোপীয় কমিউনিটির সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক নিয়েও তাঁর দলের মধ্যে মতবিরোধ বাড়তে থাকে।

ক্ষমতা থেকে বিদায়

১৯৯০ সালে কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জন মেজর।

রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পরও থ্যাচার ব্রিটিশ জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯২ সালে তিনি হাউস অব কমন্স থেকে অবসর নেন এবং ‘ব্যারনেস থ্যাচার’ উপাধিতে হাউস অব লর্ডসে প্রবেশ করেন।

২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল লন্ডনে ৮৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার

মার্গারেট থ্যাচারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আজও নানা মত রয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের ওপর তাঁর গুরুত্বারোপকে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর অর্থনৈতিক ও শিল্পনীতির সামাজিক প্রভাব, বেকারত্ব এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়গুলো সামনে আনেন।

তবে একটি বিষয়ে বিতর্ক কম—থ্যাচারের দীর্ঘ প্রধানমন্ত্রীত্ব ব্রিটিশ রাজনীতির গতিপথে গভীর পরিবর্তন এনেছিল। একজন নারী হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে উঠে আসা এবং প্রায় এক যুগ ব্রিটেনের নেতৃত্ব দেওয়া তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তাঁর নীতি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে মার্গারেট থ্যাচারের নাম ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে।

সংগৃহীত

Facebook Comments Box