ডিজিটাল রূপান্তর বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। কোনো প্রতিষ্ঠানেরই এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির বাইরে থাকার যৌক্তিক কারণ নেই। ASEAN অঞ্চলে ডিজিটাল রূপান্তর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের রাইড-হেইলিং সেবা Grab এবং ইন্দোনেশিয়ার লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান J&T Express-এর কথা বলা যায়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূল্য প্রায় ২২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ডিজিটাল রূপান্তরের কথা বললে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স্ক প্রজন্মের তুলনায় মিলেনিয়াল ও জেনারেশন Z প্রজন্ম ডিজিটাল প্রযুক্তি শেখা এবং নিজেদের জীবনযাত্রায় তা দ্রুত গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী। বাস্তবতা হলো, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত।
ডিজিটাল রূপান্তরে তরুণদের অংশগ্রহণের বাধা

তরুণদের এই বড় পরিবর্তনের অংশ হতে বাধাগ্রস্ত করার মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে।
প্রথমত, সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব তরুণদের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও শাসনব্যবস্থায় অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। ইন্দোনেশিয়া সরকার দেশে ৩ হাজারেরও বেশি অবৈধ অনলাইন ঋণসেবা শনাক্ত করেছিল—এমন খবর আমরা শুনেছি। এর অন্যতম কারণ ছিল পর্যাপ্ত ও সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাব। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এসব অনলাইন ঋণের গ্রাহকদের বড় একটি অংশ মিলেনিয়াল তরুণ। ঋণসেবা নিবন্ধন ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইনি কাঠামো না থাকলে মানুষ এসব সেবায় অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য দিতে আস্থা পাবে না।
দ্বিতীয়ত, অনেক দেশেই প্রতিবন্ধী তরুণদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নেই। প্রতিবন্ধী তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তারা ছোট বুটিক, হস্তশিল্পের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তখন প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা শেখার সুযোগ না থাকায় তারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন না।
তৃতীয়ত, তরুণদের ডেটা সায়েন্স ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দক্ষতা সম্ভাব্য নিয়োগকর্তাদের সামনে তুলে ধরার কিংবা ডিজিটাল স্টার্টআপ গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করা অনেক তরুণই বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞানকে চাকরির বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করবেন, তা বুঝতে পারেন না। অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বা হ্যাকাথন থাকলেও সেখান থেকে কোম্পানির সঙ্গে চাকরির সুযোগ তৈরি কিংবা ব্যবসায়িক ধারণা উপস্থাপনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।

অনুন্নত জনগোষ্ঠীতে প্রতিনিধিত্বের সমস্যা
ডিজিটাল রূপান্তরের আরেকটি সমস্যা হলো গ্রামসহ অনুন্নত অঞ্চলের মানুষের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব না থাকা। এসব এলাকার মানুষের জন্য ডিজিটাল ই-কমার্স গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেক ছোট পারিবারিক ব্যবসার মালিক জানেন না কোথায় অর্থ সঞ্চয় করবেন এবং কীভাবে সেই অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যবসার আর্থিক উন্নতি ঘটাবেন।
তাই প্রথমে মানুষের কাছে আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। এই দুই ধরনের জ্ঞান নিশ্চিত করার পর এমন অ্যাপ্লিকেশন বা ডিজিটাল সেবা চালু করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে তারা অর্থ বিনিয়োগ, বিক্রির হিসাব সংরক্ষণ এবং বাইরের বাজার সম্পর্কে জানতে পারবেন।
অনলাইন-টু-অফলাইন বা O2O ব্যবসায়িক মডেল স্থানীয় অর্থনীতি ও ডিজিটাল ই-কমার্সকে কাজে লাগানোর জন্য কার্যকর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তরুণরাই নিজেদের পরিবারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
এ ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র স্থানীয় উদ্যোগের সম্ভাবনা অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা পণ্যের কথা বলা যায়। এসব উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর সমবায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তরুণদের জন্য নতুন কৌশল

তরুণদের ডেটা বিষয়ে জ্ঞান এবং আর্থিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কৌশল পুনর্গঠনে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, G20 সদস্য দেশগুলোর ডেটা উন্মুক্তকরণ কৌশলের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ডেটা উন্মুক্তকরণ বলতে আগ্রহী তরুণ গবেষক ও পেশাজীবীদের সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করাকে বোঝায়। উদাহরণ হিসেবে European Space Agency (ESA)-এর উদ্যোগ উল্লেখ করা যায়। সংস্থাটি Copernicus স্যাটেলাইটের কিছু ছবি ও তথ্য উন্মুক্ত করেছিল এবং ২০২১ সালে Digital Twin Earth Challenge চালু করেছিল, যার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় তরুণ স্টার্টআপ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করে G20 সদস্য দেশগুলো আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতার জন্য তথ্য ভাগাভাগির সুযোগ দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, তরুণ উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করার ওপর G20 সদস্য দেশগুলোর আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করার একটি উপায় হতে পারে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও হ্যাকাথনের আয়োজন করা। এর মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পাবেন এবং পরবর্তীতে ডিজিটাল স্টার্টআপ গড়ে তোলার পথ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল রূপান্তরে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে আর্থিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে G20 সদস্য দেশগুলোর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে Government-to-Person বা G2P পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
G2P ব্যবস্থায় সরকার ডিজিটাল পদ্ধতিতে সামাজিক সুবিধা ও সহায়তার অর্থ সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। এর ফলে অনুন্নত অঞ্চলের মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এসব সামাজিক সুবিধার মধ্যে শিক্ষাবৃত্তি বা স্বাস্থ্যবীমার মতো কর্মসূচি থাকতে পারে, যা সরকারের সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও Sustainable Development Goals (SDGs)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সব মানুষের জন্য ডিজিটাল অর্থনীতির মাধ্যমে সম্পদ ও সুযোগ সৃষ্টি করতে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তা বিবেচনায় ডিজিটাল রূপান্তরে তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করতে G20 সদস্য দেশগুলোর সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সরকার, প্রতিষ্ঠান, তরুণ উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।



মন্তব্য করুন