দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেতা। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কন্যা হিসেবে ছোটবেলা থেকেই তিনি রাজনীতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন দেশটির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

ইন্দিরা গান্ধীর জন্ম ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর এলাহাবাদে, বর্তমান প্রয়াগরাজে। তাঁর বাবা জওহরলাল নেহরু ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে শৈশব থেকেই ইন্দিরার মধ্যে রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তিনি অল্প বয়স থেকেই যুক্ত ছিলেন।

স্বাধীনতার পর ইন্দিরা গান্ধী ধীরে ধীরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। তিনি দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৫৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হন। বাবার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়ও তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহরুর মৃত্যুর পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৬৬ সালে শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের নেতা নির্বাচিত হন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

১৯৬৭ সালের নির্বাচনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী সময়ে আরও দুবার নির্বাচিত হন। তাঁর শাসনামলে ভারতের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ব্যাংক জাতীয়করণ, দারিদ্র্য মোকাবিলার কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ তাঁর সরকারের অন্যতম পরিচিত নীতি হয়ে ওঠে।

ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন ও বিপুলসংখ্যক মানুষের ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ও মুক্তিবাহিনীকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী পূর্বাঞ্চলে আত্মসমর্পণ করে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই যুদ্ধের পর দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা এবং ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্ব দুই দেশের ইতিহাসেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

তবে ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি বড় ধরনের বিতর্কও ছিল। ১৯৭৫ সালে তিনি ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এই সময়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেপ্তার, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগ ওঠে। জরুরি অবস্থার সময় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিরোধিতা তৈরি হয়।

১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয় এবং ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতার বাইরে চলে যান। কিন্তু রাজনীতিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘটে খুব দ্রুত। ১৯৮০ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস জয়লাভ করলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন।

তাঁর দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রীত্বের শেষ বছরগুলোতে ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সে সশস্ত্র শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে ১৯৮৪ সালের জুনে ভারতীয় সেনাবাহিনী Operation Blue Star পরিচালনা করে। অভিযানে স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সে ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানি ঘটে। এই ঘটনা শিখ সম্প্রদায়ের একটি অংশের মধ্যে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

এর কয়েক মাস পর, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী তাঁর দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন। তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর ভারতজুড়ে ভয়াবহ শিখবিরোধী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যাতে বহু মানুষ নিহত হন। তাঁর মৃত্যু ভারতের রাজনীতিতে একটি গভীর শূন্যতা তৈরি করে।

ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাই একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সরকারের ভূমিকা, ভারতের আঞ্চলিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। অন্যদিকে জরুরি অবস্থা, নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগ এবং অপারেশন ব্লু স্টার তাঁর শাসনামলের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়।

তবু ভারতের ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধীর অবস্থান অনস্বীকার্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দীর্ঘ সময় দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতার মতো নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালনা করেছেন। তাঁর জীবন দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

সফলতার গল্পের সংকলন

Facebook Comments Box