মানবসেবার ইতিহাসে যেসব ব্যক্তিত্ব মানুষের মনে গভীর ছাপ রেখে গেছেন, মাদার তেরেসা তাঁদের অন্যতম। দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর জন্মনাম ছিল Anjezë Gonxhe Bojaxhiu। তিনি ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ স্কোপিয়েতে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে স্কোপিয়ে উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী। আলবেনীয় বংশোদ্ভূত একটি ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা।

মাদার তেরেসার বাবা নিকোলে বোজাক্সিউ স্থানীয় আলবেনীয় সম্প্রদায়ের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা দ্রানাফিলে ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও পরিবারকেন্দ্রিক। ছোটবেলা থেকেই মাদার তেরেসার মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানুষের প্রতি সহমর্মিতার বিকাশ ঘটে। তাঁর নামের ‘গনঝে’ শব্দটির অর্থ আলবেনীয় ভাষায় ‘ফুলের কুঁড়ি’। শৈশবেই তিনি ধর্মীয় জীবন ও মানবসেবার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

১৮ বছর বয়সে তিনি আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং Sisters of Loreto-তে যোগ দেন। সেখানেই তিনি ‘তেরেসা’ নাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি ভারতে আসেন এবং জীবনের অধিকাংশ সময় এখানেই কাটান। কলকাতায় শিক্ষকতা ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শহরের দরিদ্র মানুষের জীবন তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বিশেষ করে বস্তিতে বসবাসকারী অসহায় মানুষের দুর্দশা তাঁকে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে।

১৯৫০ সালে মাদার তেরেসা Missionaries of Charity প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের সেবা করা। শুরুতে কলকাতাকে কেন্দ্র করে কাজ করলেও পরবর্তী কয়েক দশকে সংগঠনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সংগঠনের সদস্যরা দারিদ্র্য, পবিত্রতা ও আনুগত্যের শপথ নেওয়ার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ সেবার অঙ্গীকার করেন।

মিশনারিজ অব চ্যারিটি বিভিন্ন ধরনের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে শুরু করে। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র, অনাথ শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠান, স্যুপ রান্নাঘর, চিকিৎসাকেন্দ্র, মোবাইল ক্লিনিক ও স্কুল পরিচালনার মাধ্যমে তারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এই কাজের ফলে মাদার তেরেসা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বহু দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

মানবসেবার স্বীকৃতি হিসেবে মাদার তেরেসা জীবদ্দশায় বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি Ramon Magsaysay Peace Prize পান। এরপর ১৯৭৯ সালে তাঁকে Nobel Peace Prize দেওয়া হয়। দরিদ্র ও অসুস্থ মানুষের জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের কারণে তিনি বিশ্বব্যাপী মানবসেবার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পান। পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ার পরও তিনি তাঁর সংগঠনের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যান।

তবে মাদার তেরেসার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে। তাঁর পরিচালিত কিছু মৃত্যুপথযাত্রীদের আশ্রয়কেন্দ্রে চিকিৎসার মান, ব্যথা উপশমের ব্যবস্থা এবং রোগীদের যত্নের পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকেরা এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না থাকার অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষদের আশ্রয় ও সেবা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে মূল্যায়নে প্রশংসা ও সমালোচনা—দুই দিকই আলোচিত হয়।

মাদার তেরেসা ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম চালিয়ে যায়। ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ক্যাথলিক চার্চ তাঁকে ‘Saint Teresa of Calcutta’ হিসেবে ক্যানোনাইজ বা সাধু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর মৃত্যুর দিন, ৫ সেপ্টেম্বর, বর্তমানে ক্যাথলিক চার্চে তাঁর পর্বদিন হিসেবে পালিত হয়।

মাদার তেরেসার জীবন ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস, ত্যাগ ও মানবসেবাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ অধ্যায়। দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি যে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন, তা তাঁর মৃত্যুর পরও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে বই, তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনাও ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে।

সব মিলিয়ে মাদার তেরেসার জীবন বিশ্বজুড়ে মানবসেবা, দারিদ্র্য ও সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবিক দায়িত্বের অন্যতম প্রকাশ। তাঁর কাজ যেমন কোটি মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছে, তেমনি তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই মাদার তেরেসার জীবন ও উত্তরাধিকারকে দেখা যায়।

সফলতার গল্পের সংকলন

Facebook Comments Box