এগ ফ্রিজিং কী, বাংলাদেশে খরচ কত এবং ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা কতটা?

বয়স বা চিকিৎসাজনিত কারণে সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিলে ডিম্বাণু সংরক্ষণ হতে পারে একটি বিকল্প; তবে ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না এই পদ্ধতি

ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে নারীদের মধ্যে ডিম্বাণু সংরক্ষণ বা ‘এগ ফ্রিজিং’ পদ্ধতির ব্যবহার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে oocyte cryopreservation বলা হয়। এ পদ্ধতিতে নারীর ডিম্বাশয় থেকে পরিপক্ব, নিষিক্ত না হওয়া ডিম্বাণু সংগ্রহ করে দ্রুত হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। পরে প্রয়োজন হলে ডিম্বাণু গলিয়ে শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত করে তৈরি করা ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।

তবে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই ভবিষ্যতে সন্তান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ডিম্বাণু কোন বয়সে সংরক্ষণ করা হয়েছে, কতগুলো ডিম্বাণু সংগ্রহ করা গেছে, সেগুলোর মান, পরবর্তী সময়ে ডিম্বাণু গলানোর পর কতগুলো টিকে থাকে এবং ভ্রূণ তৈরির ও জরায়ুতে স্থাপনের ফল—সবকিছুই সফলতার ওপর প্রভাব ফেলে। যুক্তরাজ্যের ফার্টিলিটি চিকিৎসা নিয়ন্ত্রক সংস্থা HFEA-ও বলছে, frozen egg treatment-এর সাফল্যের নির্ভরযোগ্য সামগ্রিক পরিসংখ্যান এখনও সীমিত। 

কেন ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন নারীরা?

নারীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমে যায়। এর ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমতে পারে। তাই তুলনামূলক কম বয়সে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে ব্যবহারের সুযোগ রাখতে পারেন কেউ কেউ। 

চিকিৎসাজনিত কারণেও ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হতে পারে। যেমন, ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা কিছু ধরনের রেডিওথেরাপি ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের চিকিৎসার আগে উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে fertility preservation বা প্রজননক্ষমতা সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ডিম্বাণু ফ্রিজিং বিবেচনা করা হয়।

এ ছাড়া ব্যক্তিগত কারণেও কেউ সন্তান নেওয়া কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে চাইলে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করতে পারেন। যেমন—পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, উপযুক্ত সঙ্গী না পাওয়া বা অন্য ব্যক্তিগত কারণে এখনই সন্তান নিতে না চাওয়া। এ ধরনের ব্যবহারকে অনেক সময় social egg freezing বলা হয়।

কীভাবে করা হয় এগ ফ্রিজিং?

প্রথমে সাধারণত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের অবস্থা ও প্রজননক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নেন। এরপর হরমোনের ওষুধ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে একই সময়ে একাধিক ডিম্বাণু পরিপক্ব করার চেষ্টা করা হয়।

ডিম্বাণুগুলো পরিপক্ব হলে সাধারণত সেডেশন বা অ্যানেসথেশিয়ার মাধ্যমে আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে একটি সূচের মাধ্যমে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়।

সংগ্রহের পর ডিম্বাণুগুলো সাধারণত vitrification নামের দ্রুত হিমায়ন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী গলিয়ে ব্যবহার করা যায়। HFEA-র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ডিম্বাণু সংরক্ষণ প্রযুক্তি আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। 

ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সময় সংরক্ষিত ডিম্বাণু গলানোর পর সেগুলোতে সাধারণত ICSI (intracytoplasmic sperm injection) পদ্ধতিতে শুক্রাণু প্রবেশ করিয়ে নিষিক্ত করা হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে ভ্রূণ তৈরি হলে সেটি জরায়ুতে স্থানান্তর করা হয়।

ডিম্বাণু ও ভ্রূণ সংরক্ষণের পার্থক্য

ডিম্বাণু সংরক্ষণের পাশাপাশি embryo freezing-ও একটি প্রচলিত fertility preservation পদ্ধতি। এক্ষেত্রে ডিম্বাণু সংগ্রহের পর শুক্রাণুর মাধ্যমে সেটিকে নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। এরপর সেই ভ্রূণ হিমায়িত করে সংরক্ষণ করা হয়।

ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সময় সংরক্ষিত ভ্রূণ গলিয়ে জরায়ুতে স্থানান্তর করা যায়। তবে ডিম্বাণু ফ্রিজিংয়ের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ব্যবহারের সময় নতুন করে শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত করার ধাপটি প্রয়োজন হয়।

ডিম্বাণু ফ্রিজ করলে কি ভবিষ্যতে সন্তান হবেই?

না। এগ ফ্রিজিং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ সংরক্ষণ করে, কিন্তু সন্তান হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।

সফলতার ক্ষেত্রে ডিম্বাণু সংরক্ষণের সময় নারীর বয়স গুরুত্বপূর্ণ। কম বয়সে সংরক্ষণ করা ডিম্বাণুর গুণগত মান সাধারণত বেশি থাকে। তবে একজন নারীর জন্য কতটি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার নির্দিষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হবে—এমন একটি সবার জন্য প্রযোজ্য সংখ্যা নেই।

HFEA জানিয়েছে, frozen egg treatment-এর সাফল্যের হার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। কারণ এই চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর বয়স, ডিম্বাণু সংরক্ষণের সময় এবং পরবর্তী ব্যবহারের তথ্য একসঙ্গে নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করা সবসময় সম্ভব হয় না। তাই কোনো নির্দিষ্ট শতাংশকে প্রত্যেক নারীর ভবিষ্যৎ সন্তান ধারণের সম্ভাবনা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। 

কতদিন ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা যায়?

সংরক্ষণের সর্বোচ্চ মেয়াদ দেশভেদে ভিন্ন। উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে ডিম্বাণু, শুক্রাণু বা ভ্রূণ চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ ৫৫ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তবে আইন অনুযায়ী প্রতি ১০ বছর পরপর সংরক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সম্মতি নবায়ন করতে হয়।HFEA জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় হিমায়িত অবস্থায় রাখার কারণে ডিম্বাণুর নিরাপত্তা বা গুণগত মান নষ্ট হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের পর ভবিষ্যৎ চিকিৎসার ফলাফল নিয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন। 

বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিংয়ের সুযোগ আছে?

বাংলাদেশেও কিছু fertility centre-এ ডিম্বাণু সংরক্ষণের সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে দেশের সামগ্রিক পরিসরে কতজন নারী ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন বা সংরক্ষিত ডিম্বাণু ব্যবহার করে কতটি সন্তান জন্ম হয়েছে—এমন জাতীয় পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সহজলভ্য নয়।

বাংলাদেশের একটি fertility centre-এর চিকিৎসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে মূলত ক্যান্সারের চিকিৎসার আগে fertility preservation-এর জন্য কিছু নারী ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেছেন। ওই চিকিৎসকের হিসাবে, তাদের প্রতিষ্ঠানে ডিম্বাণু সংগ্রহ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। ডিম্বাণু সংরক্ষণের জন্য এককালীন প্রায় ৫৫ হাজার টাকা এবং পরবর্তী সময়ে বছরে প্রায় ২০ হাজার টাকা সংরক্ষণ ফি নেওয়া হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।

তবে এগুলো কোনো জাতীয় নির্ধারিত মূল্য নয়। হাসপাতাল, fertility centre, ওষুধের প্রয়োজন, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং সংরক্ষণের মেয়াদ অনুযায়ী খরচ পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশে এগ ফ্রিজিংয়ের নির্দিষ্ট ‘সরকারি’ বা অভিন্ন খরচ হিসেবে এসব অঙ্ক উপস্থাপন করা উচিত নয়।

কী কী ঝুঁকি রয়েছে?

এগ ফ্রিজিংয়ের আগে কয়েকদিন বা প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত হরমোনের ওষুধ বা ইনজেকশন ব্যবহার করে একাধিক ডিম্বাণু পরিপক্ব করার চেষ্টা করা হয়। এর একটি সম্ভাব্য জটিলতা হলো ovarian hyperstimulation syndrome (OHSS)। গুরুতর ক্ষেত্রে এতে হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

ডিম্বাণু সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সংক্রমণ, রক্তপাত বা আশপাশের অঙ্গে আঘাতের মতো জটিলতার সামান্য ঝুঁকি রয়েছে। সেডেশন বা অ্যানেসথেশিয়ারও নিজস্ব ঝুঁকি থাকতে পারে।

এ ছাড়া হরমোনের ওষুধে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়া, পর্যাপ্ত ডিম্বাণু না পাওয়া কিংবা সংগ্রহ করা ডিম্বাণুর সবগুলো সংরক্ষণের উপযোগী না হওয়ার মতো পরিস্থিতিও ঘটতে পারে।

ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ডিম্বাণু সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন করতে সময় লাগতে পারে। ফলে ক্যান্সারের চিকিৎসা কত দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন, সেটি বিবেচনা করেই fertility preservation-এর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

শেষ কথা

এগ ফ্রিজিং নারীর ভবিষ্যৎ প্রজননক্ষমতা সংরক্ষণের একটি চিকিৎসা-পদ্ধতি। বিশেষ করে এমন নারীদের জন্য এটি বিবেচনাযোগ্য হতে পারে যাদের কোনো চিকিৎসার কারণে ভবিষ্যতে fertility কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যক্তিগত কারণেও কেউ সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিতে চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শে এই পদ্ধতি বিবেচনা করতে পারেন।

তবে এটি সন্তান পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। ডিম্বাণু সংরক্ষণের আগে বয়স, ovarian reserve, ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য সাফল্য, ঝুঁকি এবং মোট খরচ—সবকিছু fertility specialist-এর সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি।

সংরক্ষণ

Facebook Comments Box