দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা কমে আসছে জাপানে। এর মধ্যেই দেশটিতে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ১ লাখ ছাড়িয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে জাপানে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জনে। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার বেশি।

মঙ্গলবার প্রকাশিত মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, জাপানে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা টানা ৫৬তম বছরের মতো বেড়েছে। দেশটির দীর্ঘায়ু প্রবণতার পাশাপাশি জন্মহার কমে যাওয়ায় জনসংখ্যার কাঠামোতে বয়স্ক মানুষের অংশ ক্রমেই বাড়ছে।

শতবর্ষীদের বড় অংশ নারী

জাপানের শতবর্ষী জনগোষ্ঠীর বড় অংশই নারী। মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জন শতবর্ষীর মধ্যে ৯৪ হাজার ২৯৮ জন নারী, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৮৮ শতাংশ। পুরুষ শতবর্ষীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৩৭৯ জন।

পরিসংখ্যান সম্পর্কে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনিচিরো উয়েনো বলেন, এত বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘ সময় সক্রিয় ও সুস্থভাবে জীবনযাপন করছেন—এটি আনন্দের বিষয়।

দীর্ঘায়ুতে এগিয়ে জাপান

দীর্ঘায়ুর জন্য জাপান বহুদিন ধরেই পরিচিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জাপানে মানুষের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৮৪ বছর। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গড় আয়ু ছিল প্রায় ৭৯ বছর।

গবেষকরা জাপানিদের দীর্ঘায়ুর পেছনে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মতো বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি জাপানি সংস্কৃতির ‘ইকিগাই’ দর্শনও মানুষের জীবনকে অর্থপূর্ণ ও উদ্দেশ্যপূর্ণ রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে বলে অনেকে মনে করেন।

জাপানে বিশ্বের প্রবীণতমদের কয়েকজন

জাপানে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তিদের কয়েকজন বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে কিয়োটোর ১১৪ বছর বয়সী নারী ফুয়ো কিশিমোতো এবং কুমামোতোর ১১২ বছর বয়সী পুরুষ হিকারু কাতোর নাম উল্লেখ করেছে দেশটির মন্ত্রণালয়।

তবে মানুষের আয়ু বাড়ার এই প্রবণতা জাপানের জন্য একদিকে সাফল্যের প্রতীক হলেও অন্যদিকে তৈরি করছে বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

বাড়ছে বয়স্কদের পরিচর্যার চাপ

বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার ফলে স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যয়ও বাড়ছে। একই সময়ে জন্মহার রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমে যাওয়ায় কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে।

প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দেশ জাপানে জনসংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা কয়েক দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে। ফলে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মীবাহিনী সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতিতে শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় জাপান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি দক্ষ ও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়েছে। যদিও অভিবাসন ও বিদেশিদের প্রবেশসংক্রান্ত নীতিতে কিছু ক্ষেত্রে কঠোরতাও দেখা যাচ্ছে।

জাপানের বর্তমান জনমিতিক পরিস্থিতি তাই এক ধরনের বৈপরীত্য তুলে ধরছে—একদিকে মানুষ আগের চেয়ে দীর্ঘজীবী হচ্ছেন, অন্যদিকে কম জন্মহারের কারণে মোট জনসংখ্যা ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

Facebook Comments Box