আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্য, অতিরিক্ত নগদ বা স্বর্ণ দেখানোসহ কিছু ভুলে ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে করদাতাকে

দেশে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সংখ্যাও বাড়ছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে টিআইএনধারী রয়েছেন প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ নাগরিক। তাঁদের মধ্যে অন্তত অর্ধকোটি টিআইএনধারী প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন।

বর্তমানে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেকটাই অনলাইননির্ভর। ফলে রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন নথি ও আর্থিক তথ্যের সামঞ্জস্য থাকা আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অসাবধানতায় করা কিছু সাধারণ ভুল পরবর্তী সময়ে করদাতাকে আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।

রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় যে পাঁচটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন, সেগুলো হলো—

১. প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি স্বর্ণ দেখানো

অনেক করদাতা রিটার্নে স্বর্ণের পরিমাণ বাস্তবের তুলনায় বেশি দেখান। কিন্তু আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে এ ধরনের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

তাই করদাতার কাছে বাস্তবে যতটুকু স্বর্ণ রয়েছে, রিটার্নে তার প্রকৃত পরিমাণই উল্লেখ করা উচিত। স্বর্ণ কেনা বা প্রাপ্তির উৎস সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলে সেগুলোও সংরক্ষণ করা ভালো।

২. আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত নগদ দেখানো

রিটার্নে হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। আয় ও অন্যান্য সম্পদের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি নগদ দেখানো হলে সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হতে পারে।

তাই বাস্তবে যত নগদ অর্থ রয়েছে, রিটার্নে সেটিই দেখানো উচিত। নগদের উৎস বৈধ হলে তার সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথিও সংরক্ষণ করা জরুরি।

৩. উপহার পাওয়া সম্পদের তথ্য না দেওয়া

পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবান উপহারের তথ্যও যথাযথভাবে রিটার্নে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। যেমন—জমি, ফ্ল্যাট, গয়না বা অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদ।

উপহার হিসেবে পাওয়া সম্পদের ক্ষেত্রে কর প্রযোজ্যতা পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কর আইনের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু কর দিতে হবে না ভেবে সম্পদের তথ্য বাদ দেওয়া ঠিক নয়। উপহারের উৎস ও প্রাপ্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা উচিত।

৪. বিনিয়োগের তথ্য গোপন বা বাদ দেওয়া

অনেকে সঞ্চিত অর্থ এফডিআর, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু রিটার্নে এসব বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ না করা বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি করতে পারে।

বর্তমান সময়ে বিভিন্ন আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকায় বিনিয়োগের তথ্য গোপন করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং বৈধ ও যোগ্য বিনিয়োগ যথাযথভাবে রিটার্নে দেখানো হলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর সুবিধা পাওয়ার সুযোগও থাকে।

৫. আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি ব্যয় দেখানো

রিটার্নে আয় কম কিন্তু ব্যয় বেশি—এমন তথ্য দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে এসেছে।

যেমন, কোনো করদাতার ঘোষিত আয় যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ হয়, কিন্তু একই সময়ে তার জীবনযাত্রার ব্যয় বা অন্যান্য ব্যয় তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখানো হয়, তাহলে ওই অতিরিক্ত অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করতে হতে পারে।

তাই রিটার্নে আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।

প্রথম রিটার্ন থেকেই নথি গুছিয়ে রাখুন

রিটার্নে প্রথমবার যে আয়, সম্পদ ও অর্থের উৎস দেখানো হচ্ছে, সেগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা প্রস্তুত রাখা ভালো। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলিল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিনিয়োগের কাগজপত্র, সম্পদ কেনার প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ করা উচিত।

ভবিষ্যতে রিটার্নের কোনো তথ্য নিয়ে কর কর্তৃপক্ষ জানতে চাইলে এসব নথি তথ্যের সত্যতা ও অর্থের বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করবে।

তাই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় মূল বিষয় হওয়া উচিত—তথ্য গোপন নয়, বরং প্রকৃত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা।

Facebook Comments Box