মহানবমী ছিল মঙ্গলবার। এদিন সকালের দিকে ভক্তদের অঞ্জলি ও ভোগ প্রদানসহ দেবী দুর্গার সুদৃষ্টির প্রত্যাশায় মণ্ডপগুলোয় ভক্তদের ভিড় লক্ষ করা যায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। উৎসাহ-উদ্দীপনায় দিন পাড় হলেও সন্ধ্যায় ছিল বিদায়ের সুর। দুর্গতিনাশিনী মহিষাসুর মর্দিনীর আরাধনা শেষ হলে কৈলাসে ফুল, ফসল তথা শষ্য সমৃদ্ধির বার্তা দিয়ে নৌকায় চড়ে স্বামীগৃহে ফিরবেন দেবী দুর্গা।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে বিদায় নেবেন তিনি। আর সেই সঙ্গে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তর উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের আগে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শোভাযাত্রা বের হবে, যা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে সদরঘাট গিয়ে শেষ হবে।

হিন্দু সনাতন শাস্ত্রমতে, এই নবমী তিথিতে রাবণবধের পর রাজা শ্রী রামচন্দ্র এই পূজা করেছিলেন। নীলকণ্ঠ ফুল ও যজ্ঞের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় নবমী বিহিত পূজা। নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুলে সম্পদ লাভ হয়। তাই শাপলা, শালুক ও বলিদানের মাধ্যমে দশভুজা দেবীর পূজা হয়েছে। নীল অপরাজিতা ফুল মহানবমী পূজার বিশেষ অনুষঙ্গ। নবমী পূজায় যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে আহুতি দেওয়া হয়। ১০৮টি বেলপাতা, আমকাঠ ও ঘি দিয়ে এই যজ্ঞ করা হয়।

বিজয়া দশমী উপলক্ষ্যে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন বিভাগে পূজা পরিদর্শনে গেছেন। এর আগেও রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর গুলশান-বনানী ও ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে ‘উৎসব যার যার রাষ্ট্র সবার’ এই প্রত্যয়ে শন্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্যাপনের আহ্বান জানান। এছাড়াও প্রতিদিন মন্ত্রিপরিষদের সদ্য, ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতারাও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে এসব আয়োজনের নান্দনিকতা দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।

এদিকে প্রশাসনের তীক্ষ্ণদৃষ্টি ছিল দেশের সব মণ্ডপেই। ফলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিপুল উৎসাহে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরেছেন। উপভোগ করেছেন আবহমান বাংলার আবহে নির্মিত বৈচিত্র্যময় মণ্ডপ। আর এসব পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন দেশের স্বনামধন্য স্থপতি ও শিল্পীরা।

দুর্গোৎসবকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এক ভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়। মণ্ডপ প্রাঙ্গণে তৈরি করা হয় বর্ণিল তোরণ। এছাড়াও ছিল সাংস্কৃতিক আয়োজন। যেখানে দেশের স্বনামধন্য শিল্পীরা অংশ নিয়েছেন। ফলে পূজার বিচিত্র আয়োজন ও নান্দনিক সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করেন ভিন্ন ধর্মের মানুষও। সার্বিক এই ব্যবস্থার জন্য পূজা উদ্যাপন পরিষদের শীর্ষ নেতারা সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন।

বিজয়া দশমীতে থাকে সরকারি ছুটি। হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এ বছর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি তিনদিন পর্যন্ত বর্ধিত করে। শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দিনের ছুটি দেওয়া হয়। এতে ব্যাপক খুশি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপের নান্দনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত স্থপতি প্রফেসর অমিতি কুণ্ডুর ভাষ্য, দুর্গাপূজা কেবল একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসাবেই নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবেও উদ্যাপিত হয়। এই উৎসব হিন্দু সম্প্রদায় ও অন্যান্য ধর্মের মানুষকে একত্রিত করে; যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকেই তুলে ধরে।

বুধবার বিজয়া দশমী উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে। এছাড়া জাতীয় দৈনিকগুলো এ উপলক্ষ্যে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করবে।

১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসব। টানা ছয় দিনের আনন্দ উৎসবের পর বিজয়া দশমীর দিন দেবী বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

সংগৃহীত: বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনলাইন সূত্র থেকে সংগৃহীত।

Facebook Comments Box