বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন ও আধুনিকতার পথে। রাজধানী ঢাকায় গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, বাড়ছে নগরায়ণ, বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা। কিন্তু এই উন্নয়নের চিত্রের পাশেই রয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা। শহরের কিছু বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এখনো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছে বহু পরিবার। প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের মধ্যেই বেড়ে উঠছে শিশুরা।

ছবিতে দেখা যায়, একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সরু গলির পাশে ছোট ছোট ঘর। কোথাও দেয়ালের গায়ে ময়লা জমেছে, কোথাও ছড়িয়ে রয়েছে আবর্জনা ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র। খোলা জায়গায় জমে আছে পানি। আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে টানানো বৈদ্যুতিক তারও চোখে পড়ে। এমন পরিবেশে শিশুদের চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনযাপন নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

আরেকটি ছবিতে কয়েকটি শিশুকে জমে থাকা পানির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসম্মত আবাসনের গুরুত্ব এমন দৃশ্য নতুন করে সামনে আনে।

প্রতিটি শিশুর অধিকার নিরাপদ বাসস্থান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ।

প্রতিটি শিশুর অধিকার নিরাপদ বাসস্থান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ।

উন্নয়নের সঙ্গে বাড়ছে বৈষম্যের প্রশ্ন

একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু বড় সড়ক, উঁচু ভবন কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। নাগরিকদের নিরাপদ বাসস্থান, সুপেয় পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

কিন্তু নিম্ন আয়ের অনেক পরিবারের পক্ষে রাজধানীতে স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান নিশ্চিত করা কঠিন। জীবিকার প্রয়োজনে শহরে বসবাস করলেও সীমিত আয়ের কারণে তাঁদের অনেকে ঘনবসতিপূর্ণ ও অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার এলাকায় থাকতে বাধ্য হন। এর প্রভাব পড়ে শিশুদের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশের ওপর।

উন্নয়নের শহর ঢাকায়ও সবার ভাগ্যে জোটেনি স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের সুযোগ।

উন্নয়নের শহর ঢাকায়ও সবার ভাগ্যে জোটেনি স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের সুযোগ।

শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

শৈশব একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অনিরাপদ চলাচলের পথ এবং দূষিত পানির সংস্পর্শে থাকার মতো পরিস্থিতি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপদ খেলার জায়গা ও উপযুক্ত আবাসনের অভাব তাদের স্বাভাবিক শৈশব উপভোগের সুযোগ সীমিত করে।

প্রতিটি শিশুর নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো শিশুকে যেন এসব মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

আবর্জনা আর জমে থাকা পানির পাশে শৈশব কাটছে শিশুদের—নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

আবর্জনা আর জমে থাকা পানির পাশে শৈশব কাটছে শিশুদের—নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

এ ধরনের পরিস্থিতির উন্নয়নে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তাদের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বাস্তব পরিস্থিতির নিয়মিত তদারকি।

বহুতল ভবনের শহরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবন যেন উন্নয়নের আড়ালে থাকা অন্য এক গল্প।

বহুতল ভবনের শহরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবন যেন উন্নয়নের আড়ালে থাকা অন্য এক গল্প।

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজ যে পরিবেশে বেড়ে উঠছে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাই উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছায়, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা যেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পায়—সেই প্রত্যাশাই সবার।

প্রশ্ন থেকেই যায়: উন্নয়নের এই সময়ে প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ বাসস্থান ও সুস্থ শৈশব নিশ্চিত করতে আমরা কতটা এগোতে পেরেছি?

Facebook Comments Box