শৈশব মানুষের জীবনের এমন একটি অধ্যায়, যেখানে স্মৃতিগুলো কখনো পুরোনো হয় না। সময় পেরিয়ে যায়, মানুষ বড় হয়, জীবনের প্রয়োজনে ছুটে বেড়াতে হয় পৃথিবীর নানা প্রান্তে; কিন্তু শৈশবের সেই পরিচিত উঠোন, নদীর পাড়, গ্রামের পথ আর প্রিয় মানুষগুলোর স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে থেকে যায়। আমার জীবনেও তেমনই এক আবেগঘন অধ্যায়ের নাম—আমার কালিহাতী।
আমার শৈশব ও কৈশোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে UNICEF ও Save the Children-এর তত্ত্বাবধানে। আমার বাবা-মা আমাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, শিক্ষকরা দিয়েছেন জ্ঞানের আলো; আর মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা পেয়েছি আমার শ্রদ্ধেয় গুরুজন, শিক্ষক ও মেন্টরদের কাছ থেকে। আজ ফিরে তাকালে মনে হয়—আমি সত্যিই এক অসীম সৌভাগ্যের উত্তরাধিকারী।
আমার জন্ম টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কালিহাতী পৌরসভার কালিহাতী গ্রামে। আমার চোখে, আমার গ্রাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গ্রামগুলোর একটি। হয়তো পৃথিবীর মানচিত্রে এটি খুব ছোট একটি জায়গা, কিন্তু আমার জীবনের মানচিত্রে এর অবস্থান সবচেয়ে বড়।
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ফটিকজানি নদী। নদীর সঙ্গে বেড়ে ওঠার সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দেয়। একদিকে নদীর অপার সৌন্দর্য, অন্যদিকে বাড়ির সীমানা পেরোলেই উপজেলার প্রধান সড়ক। আশপাশের মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন, নদীপাড়ের নির্মল প্রকৃতি আর নাগরিক সুযোগ-সুবিধার এমন সুন্দর সহাবস্থান—সব মিলিয়ে আমার কালিহাতী আমার কাছে এক অনন্য ভূস্বর্গ।
আমাদের বাড়িটিও বেশ বড়। নানা প্রজাতির গাছপালায় ঘেরা, সময়ের ছাপ বহন করা সেই পুরোনো বাড়িটি হয়তো অন্যের চোখে খুব সাধারণ। কিন্তু আমার কাছে সেটিই পৃথিবীর সবচেয়ে আপন ঠিকানা। কারণ সেখানে আমার শেকড়, আমার স্মৃতি, আমার শৈশব—আর আছে আমার নাড়ির টান।
জীবনের প্রয়োজনে অনেক জায়গায় যেতে হয়েছে। পৃথিবীর বহু নামী-দামি শহর, গ্রাম ও দর্শনীয় স্থান দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কাশ্মীর এখনো দেখা হয়নি। তবুও যত দূরেই যাই, দিনের শেষে যে জায়গাটির কথা মনে পড়ে, যে জায়গাটিতে ফিরে মন শান্ত হয়, সেটি আমার সেই কালিহাতী গ্রাম—যেখানে আমার নাড়ি পুঁতে রাখা।
শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে আমার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে—‘মিনা’। আমার কাছে ‘মিনা’ শুধু একটি কার্টুন চরিত্র নয়; এটি আমার শৈশবের প্রেরণা, আমার স্বপ্ন, আমার দায়িত্ববোধ এবং জীবনের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।
আমার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন—আমি ‘মিনা’ কার্টুনের গল্প লেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। একজন ‘মিনা’ স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিশুদের প্রতিনিধি হয়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা, মানুষের ভালোবাসা এবং অর্জিত সম্মাননা আজও আমার হৃদয়ে অমলিন স্মৃতি হয়ে আছে।
‘মিনা’র মাধ্যমে শিশুদের সামনে শিক্ষা, সচেতনতা, অধিকার, স্বাস্থ্য, সমতা ও ইতিবাচক জীবনবোধের নানা বার্তা পৌঁছে দেওয়ার যে প্রয়াস ছিল, তা আমার কাছে শুধু একটি পেশাগত কাজ ছিল না। এটি ছিল একটি দায়িত্ব, একটি স্বপ্ন এবং একটি সুন্দর সমাজ গঠনের প্রত্যয়।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, শৈশবে পাওয়া সেই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাগুলোই আমার পরবর্তী জীবনের চিন্তা ও মূল্যবোধকে অনেকাংশে গড়ে দিয়েছে।
জীবনে যতটুকু জ্ঞান, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তার একটি অংশ আমার গ্রামের মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে চাই। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিশুদের জন্য কাজ করা এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক কিছু করার মধ্যেই আমি আমার জীবনের অর্থ খুঁজে পাই।
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের জন্য ভালো কিছু করার সুযোগ পাওয়া নিজেই এক ধরনের পুরস্কার। তাই জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে আমি আমার দেশের মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও নতুন প্রজন্মের জন্য কাজ করে যেতে চাই।
সম্প্রতি আমার ‘মিনা’ কার্টুনের সেই পথচলার কিছু প্রিয় সফরসঙ্গীর সঙ্গে তোলা একটি ছবি শেয়ার করছি। ছবিটি শুধু কয়েকজন মানুষের একসঙ্গে থাকার স্মৃতি নয়; এটি আমার জীবনের একটি বিশেষ সময়ের প্রতিচ্ছবি। সময়ের স্রোতে অনেকের সঙ্গে হয়তো আজ আর নিয়মিত যোগাযোগ নেই। কেউ কেউ ছড়িয়ে পড়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। কিন্তু আমাদের সেই সময়ের স্বপ্ন, মূল্যবোধ, মিশন ও ভিশন এখনো আমার কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, মানুষের জীবনযাত্রা বদলায়। কিন্তু শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও সম্ভাবনাময় পৃথিবীর প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না।
‘মিনা’র সেই সুন্দর পৃথিবী, শিশুদের জন্য সেই ইতিবাচক বার্তা—নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে।
খুব শিগগিরই আসছে ‘মিনা’কে ঘিরে নতুন কিছু চমক। ✨
আমার শৈশবের কালিহাতী, ফটিকজানি নদী, আমার পুরোনো বাড়ি, প্রিয় মানুষ এবং ‘মিনা’কে ঘিরে সেই দিনগুলো—সবকিছু মিলিয়েই আমার জীবনের গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আমি মনে করি, শেকড়কে ভুলে গিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় না। শেকড় আমাদের পরিচয় দেয়, সাহস দেয় এবং মনে করিয়ে দেয়—আমরা কোথা থেকে এসেছি।
তাই ভালো কিছুর সঙ্গে থাকুন।
শিশুদের স্বপ্নের সঙ্গে থাকুন।
মানুষের কল্যাণের সঙ্গে থাকুন।
দেশের মানুষ—ভালো থাকুক, ভালো কিছুর সঙ্গে থাকুক।
আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন। ❤️
— লাবনী সিদ্দিকী



মন্তব্য করুন