মহাকাশে ভয়াবহ এক সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)। একটি পুরোনো ভারতীয় স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ দ্রুতগতিতে বাংলাদেশের স্যাটেলাইটের দিকে এগিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে কর্মরত বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের দ্রুত সিদ্ধান্ত ও নিখুঁত হিসাবের মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।

সতর্কবার্তা আসে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থেকে

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে গত ৯ আগস্ট একটি জরুরি সতর্কবার্তা পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা জানায়, একটি মহাকাশ বর্জ্য বিএস-১-এর খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করতে পারে।

বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের হাতে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ছিল মাত্র কয়েক দিন। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রকৌশলীদের জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং নিয়মিত আপডেটের মাধ্যমে ধ্বংসাবশেষটির গতিপথ অনুসরণ করা হয়।

কী ছিল সেই মহাকাশ বর্জ্য?

মহাকাশে শুধু সচল স্যাটেলাইটই ঘুরে বেড়ায় না। পুরোনো ও অকেজো স্যাটেলাইটের অংশ, রকেটের টুকরো এবং নিয়ন্ত্রণ হারানো মহাকাশযানের বিভিন্ন অংশও পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। এসব বস্তুকে বলা হয় Space Debris বা মহাকাশ বর্জ্য।

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, বিএস-১-এর দিকে এগিয়ে আসা বস্তুটি ভারতের পুরোনো INSAT-1A স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। স্যাটেলাইটটি ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এবং একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তবে এর কিছু অংশ দীর্ঘ সময় ধরে মহাকাশে অবস্থান করছে।

সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত

বিপদের খবর পাওয়ার পর বিএসসিএল প্রকৌশলীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—স্যাটেলাইটটি কি সরানো হবে? সরানো হলে কোন দিকে এবং কতটা সরানো নিরাপদ?

মহাকাশে একটি স্যাটেলাইটকে ইচ্ছেমতো যেকোনো দিকে সরিয়ে দেওয়া যায় না। সামান্য পরিবর্তনও অন্য কোনো মহাকাশযানের সঙ্গে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রকৌশলীদের ধ্বংসাবশেষের গতিপথ, বিএস-১-এর অবস্থান এবং সম্ভাব্য বিকল্প পথ—সবকিছু বিশ্লেষণ করতে হয়।

শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট বিএস-১-কে কক্ষপথে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ধ্বংসাবশেষটি নিরাপদে অতিক্রম না করা পর্যন্ত স্যাটেলাইটটিকে ওই পরিবর্তিত অবস্থানে রাখা হয়।

সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ে ধ্বংসাবশেষটি বিএস-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। এরপর বিপজ্জনক সময় পার হলে স্যাটেলাইটটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় বিএস-১-এর কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি।

বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের দক্ষতার প্রমাণ

২০১৮ সালে মহাকাশে পাঠানোর পর প্রথম কয়েক বছর বিদেশি প্রযুক্তিগত সহায়তায় বিএস-১ পরিচালিত হলেও ২০২১ সাল থেকে এর পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএসসিএল। বর্তমানে গাজীপুরের জয়দেবপুর গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।

বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমানের মতে, এই ঘটনা দেশের নিজস্ব প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জটিল একটি কাজ।

এর আগেও এমন ঝুঁকি এসেছিল

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, বিএস-১-এর জন্য মহাকাশে কাছাকাছি সংঘর্ষের আশঙ্কা এটাই প্রথম নয়। ২০২১ সালেও রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট বিএস-১-এর খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।

২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা বিএস-১ বাংলাদেশের যোগাযোগ ও সম্প্রচার অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে, যার একটি অংশ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং অন্য অংশ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

মহাকাশে বাড়তে থাকা বর্জ্য ভবিষ্যতে স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের বিএস-১-এর সাম্প্রতিক ঘটনা তাই শুধু একটি দুর্ঘটনা এড়ানোর গল্প নয়; এটি দেখিয়ে দিয়েছে, মহাকাশ প্রযুক্তির মতো জটিল ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা দক্ষতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের সম্পদ সুরক্ষা করতে সক্ষম।

Source: The Daily Star, Prothom Alo & Bangladesh Satellite Company Limited (BSCL)
Facebook Comments Box