নান্দাইলকে হারিয়ে জেলা প্রশাসক উইমেন্স গোল্ডকাপ-২০২৬ ধোবাউড়ার ঘরে

গারো পাহাড়ের পাদদেশে সকাল হলে অন্য অনেক দিনের মতোই মাঠে নামত মেয়েগুলো। কারও পায়ে দামি বুট ছিল না, কারও সামনে ছিল না বড় কোনো স্টেডিয়ামের আলো। ছিল শুধু একটি বল, খেলার ইচ্ছা আর একদিন বড় কিছু করে দেখানোর স্বপ্ন।

সেই স্বপ্ন এবার ট্রফিতে রূপ নিয়েছে।

নান্দাইলকে হারিয়ে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক উইমেন্স গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ধোবাউড়া উপজেলা। পাহাড়ঘেরা এই জনপদের ১৮ কিশোরী এখন একটি শিরোপার সঙ্গে বহন করছে আরও বড় একটি বার্তা—সুযোগ পেলে প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েরাও মাঠের গল্প বদলে দিতে পারে।

স্কোরের চেয়েও বড় যে গল্প

ফুটবল ম্যাচের ফল কয়েক লাইনে লেখা যায়। কিন্তু একটি দল তৈরি হওয়ার গল্প কখনো এত ছোট নয়।

ধোবাউড়ার মেয়েদের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিয়মিত অনুশীলন, শারীরিক প্রস্তুতি, দলগত বোঝাপড়া এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও মাঠে টিকে থাকার মানসিকতা। কখনো ভুল হয়েছে, কখনো চাপ এসেছে, কখনো ম্যাচ কঠিন হয়ে উঠেছে। কিন্তু থামেনি তারা।

প্রতিটি অনুশীলন তাদের একটু একটু করে বদলেছে। আর শেষ পর্যন্ত সেই পরিশ্রমই এনে দিয়েছে জেলার অন্যতম কাঙ্ক্ষিত নারী ফুটবলের শিরোপা।

এক কোচের বিশ্বাস, একদল মেয়ের বদলে যাওয়া

এই দলের পাশে শুরু থেকে কাজ করেছেন কোচ জুয়েল রানা।

প্রতিদিনের অনুশীলনে তিনি শুধু পাস, শট কিংবা কৌশল শেখাননি; মেয়েদের শিখিয়েছেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাঠে দাঁড়াতে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অনুশীলনে সময় দেওয়া, ভুলের পর আবার চেষ্টা করা এবং শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া—এসবই ছিল প্রস্তুতির অংশ।

একজন কোচের কাজ অনেক সময় স্কোরবোর্ডে দেখা যায় না। কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাসে তার ছাপ থেকে যায়। ধোবাউড়ার মেয়েদের এই অভিযানে জুয়েল রানার সেই নেপথ্য ভূমিকার কথাও উঠে আসছে বারবার।

১৮ জন, একটি দল, একটি পরিচয়

চ্যাম্পিয়ন ধোবাউড়া দলের ১৮ খেলোয়াড় হলেন—

তাসলিমা আক্তার, শিউলি আজিম, শশিকলা দাংগ, রনি আক্তার, তানিয়া আক্তার, মারিয়া মান্দা, সনিয়া আক্তার সাথী, সানজিদা আক্তার, মার্জিয়া আক্তার, তুহুরা আক্তার, শামসুন্নাহার জুনিয়র, শামসুন্নাহার সিনিয়র, রুজিনা আক্তার, সেলিনা খাতুন, রিতিকা রিছিল প্রাপ্তি, পিংকি রানীদাস, শ্রাবণী রানীদাস ও সান্ত্বনা রবিদাস।

দলের অধিনায়ক সানজিদা আক্তার। কোচ জুয়েল রানা।

এই ১৮ জনের পরিচয় এখন শুধু একটি উপজেলার খেলোয়াড় হিসেবে নয়; তারা ধোবাউড়ার নারী ফুটবলের নতুন মুখ।

ট্রফির সঙ্গে বদলাতে পারে আগামী দিনের ছবি

একটি স্থানীয় টুর্নামেন্টের শিরোপা হয়তো জাতীয় পর্যায়ের বড় কোনো অর্জনের সমান নয়। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের জন্য এমন একটি জয় অনেক সময় আরও বড় দরজা খুলে দিতে পারে।

একজন কিশোরী যখন দেখে তার মতো আরেকজন মাঠে নেমে জিতছে, তখন তার নিজের স্বপ্নটাও একটু বড় হয়। ধোবাউড়ার এই সাফল্য তাই মাঠের বাইরে থাকা আরও অনেক মেয়েকে খেলাধুলায় আসার অনুপ্রেরণা দিতে পারে।

প্রয়োজন এখন এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা—নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ অনুশীলন পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করা।

সাফল্যের পেছনে যারা

খেলার মাঠে ১৮ জনের নাম থাকলেও এই জয় তৈরি হয়েছে আরও অনেক মানুষের সহযোগিতায়। পরিবার, অভিভাবক, স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ, কোচ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহায়তা এই যাত্রাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দলের কার্যক্রমে সহযোগিতা ও সার্বিক তদারকির জন্য সংশ্লিষ্টরা ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক এবং ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোশারফ হোসাইন-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন—এর পরের স্বপ্ন কী?

ট্রফি হাতে উৎসব হয়তো আজ শেষ হবে। কিন্তু ধোবাউড়ার মেয়েদের গল্প এখানেই শেষ হওয়ার নয়।

কারণ এই কাপ শুধু একটি প্রতিযোগিতার জয় নয়। এটি এমন একটি জনপদের মেয়েদের গল্প, যারা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মাঠ বেছে নিয়েছে। যারা প্রমাণ করেছে, বড় শহরের বাইরে থেকেও বড় স্বপ্ন দেখা যায়।

গারো পাহাড়ের ছায়ায় বেড়ে ওঠা সেই মেয়েদের হাতে আজ ট্রফি। আগামী দিনে সেই হাতেই হয়তো উঠবে আরও বড় কোনো শিরোপা।

Facebook Comments Box