শিশু দিবস শিশুদের সম্মানে প্রতিবছর পালিত একটি স্মরণীয় দিন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি ভিন্ন ভিন্ন তারিখে পালিত হয়। শিশুদের অধিকার, কল্যাণ, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
শিশু দিবসের শুরু
শিশুদের জন্য বিশেষ দিন পালনের ইতিহাস উনিশ শতকেও পাওয়া যায়। ১৮৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের চেলসিতে ইউনিভার্সালিস্ট চার্চের ধর্মযাজক রেভারেন্ড ড. চার্লস লিওনার্ড শিশুদের জন্য বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। দিনটি প্রথমে ‘রোজ ডে’, পরে ‘ফ্লাওয়ার সানডে’ এবং শেষ পর্যন্ত ‘চিলড্রেনস ডে’ নামে পরিচিত হয়।
১৯২০ সালে তুরস্ক প্রথম দেশ হিসেবে ২৩ এপ্রিলকে শিশুদের জন্য জাতীয় দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। পরে ১৯২৯ সালে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক দিবসটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন।

আন্তর্জাতিক শিশু দিবস
১৯২৫ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত World Conference on Child Welfare-এ প্রথম আন্তর্জাতিক শিশু দিবস ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরপর ৪ নভেম্বর ১৯৪৯ সালে মস্কোতে Women’s International Democratic Federation ১ জুনকে International Day for Protection of Children হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৫০ সাল থেকে ১ জুন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং কিছু নিরপেক্ষ আন্দোলনের দেশ এই তারিখটি অনুসরণ করে।
বিশ্ব শিশু দিবস: ২০ নভেম্বর
জাতিসংঘের উদ্যোগে শিশুদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবস হলো World Children’s Day, যা প্রতিবছর ২০ নভেম্বর পালিত হয়।
১৯৫৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বজনীন শিশু দিবস পালনের জন্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়। এর লক্ষ্য ছিল শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব বাড়ানো এবং শিশুদের কল্যাণ ও অধিকার নিশ্চিত করা।
২০ নভেম্বর তারিখটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ Declaration of the Rights of the Child গ্রহণ করে। একই তারিখে ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ Convention on the Rights of the Child (CRC) গ্রহণ করে। এই সনদ শিশুদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আইনগত কাঠামো।
শিশুদের অধিকার ও বর্তমান উদ্যোগ
বিশ্ব শিশু দিবস শুধু শিশুদের নিয়ে আনন্দ-উৎসবের দিন নয়; এটি বিশ্বজুড়ে শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা এবং মতপ্রকাশের অধিকার এ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাতিসংঘ ও ইউনিসেফ শিশুদের জন্য টিকাদান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে। একই সঙ্গে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, শিশু নির্যাতন, পাচার, সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের ব্যবহার এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করা হচ্ছে।
১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) শিশুশ্রমের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ভয়াবহ ধরনগুলো নিষিদ্ধ ও বিলোপের জন্য Convention No. 182 গ্রহণ করে। এর আওতায় দাসত্ব, শিশুপাচার, যৌন শোষণ এবং শিশুদের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য শ্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শিশু দিবসের মূল বার্তা
শিশু দিবসের মূল বার্তা হলো—প্রতিটি শিশুর অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন তারিখে শিশু দিবস পালিত হলেও লক্ষ্য একটাই: শিশুদের জন্য নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও অধিকারভিত্তিক ভবিষ্যৎ তৈরি করা।
সংক্ষেপে সময়রেখা:
১৮৫৭ — যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের জন্য বিশেষ দিবস পালনের সূচনা
১৯২০ — তুরস্কে ২৩ এপ্রিল জাতীয় শিশু দিবস
১৯২৫ — জেনেভায় আন্তর্জাতিক শিশু দিবসের উদ্যোগ
১৯৪৯ — ১ জুন আন্তর্জাতিক শিশু সুরক্ষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
১৯৫০ — বহু দেশে ১ জুন শিশু দিবস পালনের শুরু
১৯৫৪ — জাতিসংঘ সর্বজনীন শিশু দিবস পালনের আহ্বান জানায়
১৯৫৯ — শিশু অধিকার ঘোষণা গ্রহণ
১৯৮৯ — শিশু অধিকার সনদ (CRC) গ্রহণ
২০ নভেম্বর — প্রতিবছর বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হয়।
সংগৃহীত: জাতিসংঘ (UN), ইউনিসেফ (UNICEF) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)।



মন্তব্য করুন