এলেন জনসন সারলিফ—লাইবেরিয়া
আফ্রিকার রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারী নেতৃত্বের নাম এলেন জনসন সারলিফ। তিনি লাইবেরিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট এবং আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি গৃহযুদ্ধ, নির্বাসন এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়েও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেন।
সারলিফ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষ করে নিজ দেশ লাইবেরিয়ায় ফিরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং অর্থনীতি ও প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
লাইবেরিয়ার ইতিহাসও সারলিফের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ১৯ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের মুক্তিপ্রাপ্ত কৃষ্ণাঙ্গ দাস ও তাদের বংশধরদের উদ্যোগে দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত দেশটির উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।
লাইবেরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় সারলিফকে দেশের বাইরে থাকতে হয়। তিনি কেনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন কাটান। এ সময় তিনি ব্যাংকিং খাতে কাজ করেন এবং জাতিসংঘের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০০৫ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লাইবেরিয়ায় প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে একাধিক পুরুষ প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সারলিফ বিজয়ী হন। এর মাধ্যমে তিনি আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সারলিফের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করা। তাঁর সরকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, অর্থনীতি পুনর্গঠন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়।
সারলিফের শাসনামলে লাইবেরিয়ার বিপুল বৈদেশিক ঋণের বোঝা কমানোর ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর প্রশাসন দেশটির অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লাইবেরিয়ার ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে।
নারীর অধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার জন্য সারলিফ আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ স্বীকৃতি পান। ২০১১ সালে তিনি লাইবেরিয়ার শান্তিকর্মী লেমাহ গবউই এবং ইয়েমেনের মানবাধিকারকর্মী তাওয়াক্কুল কারমানের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। নারীর নিরাপত্তা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীদের অংশগ্রহণের জন্য তাঁদের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
তবে সারলিফের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়টি সমালোচনামুক্ত ছিল না। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। তাঁর তিন ছেলে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ায় নিয়োগের ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। দুর্নীতি মোকাবিলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর সরকার বিভিন্ন সমালোচনার মুখে পড়ে।
সারলিফ ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতা ছাড়ার পরও তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন। বিশেষ করে সুশাসন, উন্নয়ন, নারীর অধিকার এবং নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে তিনি যুক্ত থেকেছেন।
এলেন জনসন সারলিফের রাজনৈতিক জীবন তাই লাইবেরিয়ার যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন এবং আফ্রিকার রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর শান্তি প্রতিষ্ঠা, ঋণ কমানো ও নারীর অধিকার নিয়ে কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আলোচনার অংশ হয়ে রয়েছে।
আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সারলিফের প্রেসিডেন্ট হওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংগৃহীত



মন্তব্য করুন